জাফলংয়ে পানিতে ডুবে ১২ বছরে হারিয়েছে ৫৩ প্রাণ

অথর
আবুল হোসেন  সিলেট প্রতিনিধি
প্রকাশিত :২৭ আগস্ট ২০১৮, ৩:০২ অপরাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 58 বার
জাফলংয়ে পানিতে ডুবে ১২ বছরে হারিয়েছে ৫৩ প্রাণ

সিলেটের অন্যতম পর্যটন স্পট জাফলংয়ে গত শনিবার বেড়াতে এসে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারিয়েছেন কলেজছাত্র রিফাত আহমদ (১৯)। রিফাত ঢাকার উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁওয়ের আবু সাইদের ছেলে ও ঢাকা সিটি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এ সময় আহতাবস্থায় উদ্ধার করা হয় তার সহোদর শিফাত ও ঢাকার ৩০২ শাহজাহানপুরের আব্দুল বারেকের ছেলে সানিকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত শনিবার সকালে রিফাতসহ তিন তরুণ পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটতে নামে। মুহূর্তের মধ্যে রিফাত তলিয়ে যায়। অন্য দু’জন খানিকটা সাঁতার জানায় ডুবে যাওয়ার আগেই দমকল বাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। এ নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১২ বছরে জাফলংয়ে বেড়াতে এসে পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন নানা বয়সের ৫৩ জন। তাদের বেশির ভাগই কিশোর ও তরুণ। পাহাড়ী নদীর চোরাবালিতে পড়া ও সাঁতার না জানাই তাদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের জাফলং। পাহাড় টিলা আর চা বাগান সংলগ্ন সীমান্ত ঘেঁষা জাফলং প্রকৃতিকন্যা নামেও পরিচিত। সিলেট নগরী থেকে ৫৯ কিলোমিটার দূরে জাফলংয়ের অবস্থান। গোয়াইনঘাট উপজেলার অধীন জাফলংয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই সেখানে আসেন নানা বয়সের দেশী-বিদেশী পর্যটক। ঈদ ও অন্যান্য ছুটির সময়ে জাফলংয়ে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়। এখানে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে স্বচ্ছ জলরাশির পিয়াইন নদী। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে এই নদী থেকে পাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট গর্তে বালু জমে চোরাবালির সৃষ্টি হওয়ায় এবং স্বচ্ছ জলধারায় গভীরতা কম দেখা যাওয়ায় কেউ কেউ পানিতে গোসল করতে নেমে তলিয়ে যান। পরে তাদের লাশ পাওয়া যায়। ছোট নৌকায় ভ্রমণ করতে যেয়েও পিয়াইন নদীতে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর জাফলংয়ের পিয়াইন নদীর জিরো পয়েন্ট এলাকায় গোসল করতে নেমে স্রোতের টানে তলিয়ে প্রাণ হারান দুই শিক্ষার্থী। তারা হলেন- ময়মনসিংহ এ্যাপোলো ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের ছাত্র কামাল শেখ ও চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ফয়সল হোসেন সৌরভ। ২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মারা যান রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সোহরাব (১৫) নামের এক কিশোর। ২৪ আগস্ট পিয়াইন নদী থেকে ফরিদ আহমদ নামের এক শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ফরিদ গোয়াইনঘাট উপজেলার উত্তর প্রতাপপুর (পান্তুমাই) গ্রামের মৃত রশিদ আলীর ছেলে। ১৯ আগস্ট জাফলংয়ের পিয়াইন নদীতে ডুবে মারা যান বেড়াতে আসা মো: আসিফ (১৭) নামের এক কিশোর। তার বাড়ি গাজীপুরের টঙ্গীর এরমাদপুর গ্রামে। ওই বছরের ৩ আগস্ট জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টে পিয়াইন নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে প্রাণ হারান সিলেট ব্লু-বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র আশফাক সিদ্দিকী।
২০১৫ সালের ২২ জুলাই ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পিয়াইন নদীতে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারান ঢাকার দুই কলেজ ছাত্র। আব্দুল্লাহ অন্তর (১৮) ও সোহাগ ঘোষ (১৭) নামের এই দুই তরুণ ঢাকার কবি নজরুল কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। ২০১৪ সালে তিন দিনের ব্যবধানে নদীতে গোসল করতে নেমে ও নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান শিশুসহ ৬ জন। ওই বছরের ২ আগস্ট প্রাণ হারান নারায়ণগঞ্জের জসিম উদ্দিন। এর আগে ৩১ জুলাই পিয়াইন নদীতে নৌকাডুবে মারা যান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাকিল (১০), মামুন (২২) ও সাদেক হোসেন (২০)। একই দিনে চোরাবালিতে হারিয়ে যান সিলেটের শাহী ঈদগাহ হোসনাবাদ এলাকার কামরুল (২০) এবং সাঁতার কাটতে গিয়ে মারা যান অজ্ঞাত এক যুবক। ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এক দশকে পিয়াইন নদীতে ডুবে মারা গেছেন আরো ৩৮ জন। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকার শনির আখড়া এলাকার শুভ আহমদ, ২৫ অক্টোবর ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কলেজছাত্র ইমরান হোসেন এবং ৩০ মে মাদারীপুর সদর উপজেলার চলকিপুর গ্রামের মো: ইব্রাহীমসহ ৪ জন মারা যান। ২০১২ সালের ২২ আগস্ট ঢাকা জেলার ফাহাদ উদ্দিন, ৩০ আগস্ট মৌলভীবাজারের কুলাউড়া এলাকার হিমেল রাজ সঞ্জয়সহ দুইজন মারা যান। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার খিলগাঁও এলাকার তারেক আহমেদ, ২০ মে রফিকুল ইসলাম ও গৌরাঙ্গ কর্মকার, ২২ মে ঢাকার শাহরিয়ার আহমেদ রাব্বি, ২ জুলাই ঢাকার তেজগাঁও এলাকার শাহরিয়ার শফিক, ৩০ জুলাই জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ এলাকার মুস্তাকিন তালুকদার, ১২ সেপ্টেম্বর ঝালকাঠি জেলার রুহুল আমিন খান রুমিসহ সাতজন মারা যান। ২০০৯ সালের ২৬ জানুয়ারি হবিগঞ্জ বানিপুর এলাকার ইউনুছ মিয়া, ৮ মে ঢাকার মিরপুরের ফারুক আহমদ, ২১ জুন নরসিংদী সদর এলাকার সজিব মিয়াসহ তিনজন মারা যান। ২০০৮ সালের ৯ নভেম্বর ঢাকার পল্লবী এলাকার দিলশাদ আহমেদ ও ২০০৬ সালের ১৬ ফেব্রুুয়ারি গোয়াইনঘাট উপজেলার মুসা মিয়া, ১৬ আগস্ট একই উপজেলার ফখরুল ইসলামসহ দুইজন মারা যান। ২০০৪ সালে ২ জন, ২০০৫ সালে ১ জন এবং ২০০৭ সালে ২ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়। ২০০৩ সালের ১৫ আগস্ট জাফলংয়ে পিয়াইন নদীতে ডুবে প্রাণ হারান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেজাউর রহমান ফয়সাল ও রাজন আহমদ।
জাফলংয়ে পানিতে ডুবে পর্যটকদের মৃত্যুর ব্যাপারে গোয়াইনঘাটের ইউএনও বিশ্বজিত কুমার পাল জানান, পর্যটকদের সতর্ক করার জন্য পুলিশ প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বিজিবি, আনসার সদস্য, ট্যুরিস্ট গাইড, স্কাউট সদস্যরা নিয়োজিত থাকলেও তাদের নিষেধ অমান্য করে সাঁতার কাটতে গিয়ে এ রকম অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনাগুলো ঘটে। এ ছাড়া পর্যটন কেন্দ্র জাফলংয়ে বিভিন্ন সময় পর্যটকদের সতর্ক করার জন্য সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড সাঁটানোসহ নানা উদ্যোগ নিলেও অনেকেই তা আমলে নেন না। তিনি জানান, প্রতি বছরই ঈদের ছুটিতে জাফলংয়ে হাজার হাজার পর্যটক বেড়াতে আসেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়। গত চার দিন জাফলংয়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বে ছিলেন।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেয়ার করে  সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + nine =