রাজ্য-কেন্দ্র দ্বন্দ্বে লাভবান মমতা!

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 41 বার
রাজ্য-কেন্দ্র দ্বন্দ্বে লাভবান মমতা! রাজ্য-কেন্দ্র দ্বন্দ্বে লাভবান মমতা!

হঠাৎ করেই পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের রাজনীতিতে নজিরবিহীন উত্তেজনা। গেল সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গে ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) ও পুলিশের সংঘাত রূপ নেয় রাজ্য-কেন্দ্র দ্বন্দ্বে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তার বাহিনী দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে অভিযোগ তুলে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার দাবিতে রাজপথে বসেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনদিন অবস্থান ধর্মঘটের (ধর্না) পর সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশে কর্মসূচি স্থগিত করেন মমতা। চলতি মাসের মাঝামাঝি একই ইস্যুতে নয়াদিল্লিতে বসার হুমকি দিয়ে রেখেছেন তিনি। কিন্তু সবার মনে একটাই প্রশ্ন-একজন পুলিশ কমিশনারকে বাঁচাতে মমতা কেন এত বড় পদক্ষেপ নিলেন। এটা শুধু কেন্দ্রের ভূমিকা বিরোধিতার জন্য নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে এর পেছনে?

গত ৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সিবিআই’র কর্মকর্তারা কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে দুর্নীতির মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে তার বাসভবনে যাওয়ার পর থেকেই ঘটনার শুরু। সিবিআই’র দাবি পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার চাঞ্চল্যকর সারদা চিট ফান্ড ও রোজভ্যালি দুর্নীতি মামলায় জব্দ করা তথ্য-উপাত্ত তাদেরকে দেননি। এমনকি এসব তথ্য-উপাত্ত নষ্ট করেছেন তিনি। এই দুর্নীতির পেছনে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

বেশ কয়েকবার তলব করা হলেও সিবিআই’র জেরায় হাজির হননি কমিশনার রাজীব কুমার। এর প্রেক্ষিতে তাকে জেরা করতে আগে থেকে কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়ে সিবিআই-এর গোয়েন্দারা রাজীব কুমারের বাসভবনে যান। প্রথমে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সিবিআই কর্মকর্তাদের বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেয়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। এক পর্যায়ে পুলিশ সিবিআই কর্মকর্তাদের টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে স্থানীয় থানায় নিয়ে যায় এবং তাদেরকে সেখানে আটক করে রাখে।

এই ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে সরাসরি পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। সেখানে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সিবিআই’কে ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন এবং হেনস্থার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক কলকাতার ধর্মতলায় অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। মমতার এই কর্মসূচির পর পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। মমতার এই কর্মসূচিতে সংহতি জানান উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টির নেতা কিরণময় নন্দ ও বিহারের বিরোধী দলীয় নেতা তেজস্বী যাদব। সংহতি জানিয়ে মমতাকে ফোন করেন কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খড়গে, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদব প্রমুখ। ফলে মমতার আন্দোলন রূপ নেয় বিরোধীদের সরকারবিরোধী জাতীয় আন্দোলনে।

তিন দিনের মাথায় সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয় যে, সিবিআই ডাকলেই জেরার জন্য হাজিরা দিতে হবে পুলিশ কমিশনার রাজীবকে। তবে তাকে গ্রেফতার করা যাবে না। সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশে নৈতিক জয় এসেছে দাবি করেন মমতা। পরে অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু’র অনুরোধে ধর্মঘট তুলে নেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কলকাতায় যে হাইভোল্টেজ ড্রামা হয়েছে তাতে সাময়িক বিরতি আসলেও এই সংঘাত যে সহজে মিটছে না। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যে সরকারকে ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রের রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এস আর বোম্মাই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সে প্রক্রিয়া অনেক কঠিন হয়ে গেছে। এখন আর প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা হলেই অত সহজে কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ফেলে দেওয়া সহজ নয়। কিন্তু তারপরও রাজ্যকে বিড়ম্বনায় ফেলার অনেক হাতিয়ার এখনো কেন্দ্রের হাতে আছে। আর মূলত এ কারণেই বিজেপির বিরুদ্ধে খেপেছেন মমতা ব্যানার্জি। যাতে কেন্দ্রীয় সরকার সহজেই রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।

সারদা ও রোজভ্যালি কেলেঙ্কারিতে তৃণমূল নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আগে বিষয়টি আরও প্রকাশ পেলে তাতে বেকায়দায় পড়তে পারেন মমতা ব্যানার্জি। যিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বেশ ভালোভাবেই আলোচনায় আছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মমতা ব্যানার্জি আসলে খুব সুকৌশলে এই লড়াইটাকে একটা ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্য’ চেহারা দিতে পেরেছেন। কলকাতার পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে সিবিআই’কে পাঠিয়ে কেন্দ্র কি ঠিক করেছে? কিংবা নিজের পছন্দের পুলিশ কর্মকর্তাকে আড়াল করতে মুখ্যমন্ত্রীর ধরনায় বসা কি ঠিক হয়েছে? এখন বাগ-বিতণ্ডা চলছে এসব ইস্যুতে। এর আড়ালে চাপা পড়ে গেছে সারদা বা রোজভ্যালি চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির মূল অভিযোগই। এসব প্রতারক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গে যে লাখ লাখ গরিব আমানতকারীর সারা জীবনের সঞ্চয় হাতিয়ে নিয়েছে সেটা এখন আর আলোচনায় নেই।

অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এই কর্মসূচি দিয়ে লোকসভা নির্বাচনের মাস তিনেক আগে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। মোদী সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে আরেকবার গোটা ভারতের বিরোধী নেতাদের একজোট করেছেন সফলভাবে। মমতার নেতৃত্ব জাতীয় রাজনীতিতে অন্য মাত্রাও পেয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মমতার ভাগ্য নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনে বিরোধীদের ঐক্য আর ভালো ফলের ওপরই।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেয়ার করে  সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × four =